বিএনপি-জামাত

এদের (বিএনপি)প্রতিষ্ঠাতার আমলে বিচার বহির্ভূত গুম-খুনের ইতিহাস : মানবাধিকারের দোকানদাররা কোথায়?

স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের আমলে (১৯৭৫-৮১) দেশে ২৬টির মতো সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছিল বলে বিভিন্ন ভাষ্যে জানা যায়। কেউ কেউ বলেন সংখ্যাটি ২১। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭৭ সালের ২রা অক্টোবর। এই অভ্যুত্থানটি সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি তথ্য জানা যায়। বাকিগুলো ধোঁয়াশার আড়ালে। অক্টোবরের সেই অভ্যুত্থানে ঘটনাস্থলেই নিহত হন শতাধিক সেনা অফিসার। অনেকে নিহত হন অভ্যুত্থান দমাতে গিয়ে। আবার বিচারের নামে মেরে ফেলা হয় কয়েকশ সেনাকে।

স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের আমলে (১৯৭৫-৮১) দেশে ২৬টির মতো সামরিক অভ্যুত্থান ঘটেছিল বলে বিভিন্ন ভাষ্যে জানা যায়। কেউ কেউ বলেন সংখ্যাটি ২১। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৭৭ সালের ২রা অক্টোবর। এই অভ্যুত্থানটি সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি তথ্য জানা যায়। বাকিগুলো ধোঁয়াশার আড়ালে। অক্টোবরের সেই অভ্যুত্থানে ঘটনাস্থলেই নিহত হন শতাধিক সেনা অফিসার। অনেকে নিহত হন অভ্যুত্থান দমাতে গিয়ে। আবার বিচারের নামে মেরে ফেলা হয় কয়েকশ সেনাকে।

সব মিলিয়ে মোট সংখ্যাটি সাড়ে ৩ হাজারের মতো হতে পারে। তাদের মধ্যে ১ হাজার ৩০০ জনের বেশি সেনাকে ফাঁসি ও ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে হত্যা করা হয়। বাকিদের মৃত্যুর কোনো দালিলিক প্রমাণ নেই। সেই সময় থেকে আজও তারা পরিবারের কাছে নিখোঁজ। সেসময় এবং পরবর্তী সময়ে কখনই বাংলাদেশে দায়িত্বরত মানবাধিকার সংস্থাগুলোর এ ইস্যুতে কথা বলেনি। অদ্ভূত কোনো কারণে তাদের মুখে কুলুপ।

জিয়াউর রহমানের আমলে সামরিক বাহিনীতে অভ্যুত্থানচেষ্টার ঘটনা ও মৃতের সুনির্দিষ্ সংখ্যা মেলানো খুবই কঠিন। কারণ এ নিয়ে খুব বেশি গবেষণা হয়নি। গবেষণার সুযোগও দেওয়া হয়নি, যতদিন জিয়া বেঁচে ছিলেন। এমনকি যাদেরকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে ২ মিনিটের শুনানি ও রায়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই হত্যা করা হয়েছিল, সেসব রায়ের কোনো কপি পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়নি।

প্রায় ৪৫ বছর পর গত বছর জাতীয় সংসদের চতুর্দশ অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিয়ার আমলে নিহতদের তালিকা করার নির্দেশ দেন। তবে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, এ রকম একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা কতটা কঠিন? এটি আদৌ কি সম্ভব? কারণ, সেই সময়ের বেশির ভাগ প্রত্যক্ষদর্শী জীবিত নেই। আবার অনেক দালিলিক প্রমাণ নষ্ট করা হয়েছে জিয়ার নির্দেশে। এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ গবেষণা প্রায় হয়নি বললেই চলে।

যেভাবে নষ্ট করা হয়েছিল সেসব নথি:

জিয়া আমলে বিচার বহির্ভূত গুম-খুন বিষয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান করেছেন সাংবাদিক ও গবেষক জায়েদুল আহসান পিন্টু। তিনি বলেন, এটা খুব কঠিন কাজ হলেও একেবারে অসম্ভবও নয়। হয়ত এখনও ব্যক্তিগতভাবে কিছু দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যাবে। কিছু ঘটনার সাক্ষী ও স্বজন এখনও বেঁচে আছেন। দ্রুত কাজ শুরু করলে হয়তো এখনও সত্যের খুব কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব। তবে দেরি করলে বা আরও ১০ বছর পর করলে কিছুই মিলবে না। আমি কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, ওই ৫ বছরে কমপক্ষে ১৯টি অভ্যুত্থানের ঘটনা ঘটেছিল। তবে নিহতের সংখ্যা কারও কাছে এককভাবে নাই। হয়তো বিচ্ছিন্নভাবে আছে।

জায়েদুল আহসান বলেন, যত দ্রুত সম্ভব একটি তথ্যানুসন্ধানী কমিশন গঠন করা দরকার। যে কমিশন ওই সময়কালের হত্যা, হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার হত্যা, বিনা বিচারে হত্যা এবং বিচারের নামে প্রহসনের ট্রাইব্যুনালে হত্যা বা ফাঁসি– এসব কিছুর তথ্য সংগ্রহ করবে। তথ্য সংগ্রহের উপায় হলো দলিল-দস্তাবেজ বা মৌখিক সাক্ষ্য গ্রহণ। এসব দলিল-দস্তাবেজ দুই সামরিক সরকারের আমলেই (জিয়া ও এরশাদ) নষ্ট করে ফেলা হয়েছে বা পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। তবে এখনও ব্যক্তিগত পর্যায়ে কারও কারও কাছে থাকতে পারে। সেগুলো আহ্বান করা ও সেই সময়ের মানুষের সাক্ষ্য গ্রহণ করা যেতে পারে।

তিনি বলেন, এই তথ্যানুন্ধানী কমিটিকে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন করতে হবে, যাতে তথ্য চেয়ে তারা যে কাউকে তলব করতে বা সমন জারি করতে পারে। তিনি যদি প্রধানমন্ত্রী বা সেনাপ্রধানও হন, তবু কমিশনে এসে তথ্য দিতে বাধ্য থাকেন। এই কমিশন দুভাবে গঠিত হতে পারে। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একজন বিচারপতি বা সাবেক প্রধান বিচারপতি হতে পারেন এর প্রধান। তার সঙ্গে সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা, আইনজীবী, সাংবাদিক ও গবেষক থাকতে পারেন। আবার সংসদীয় কমিটিও হতে পারে। সেখানে সাংসদ, মন্ত্রী থাকতে পারেন। দুটি কমিটি একসঙ্গেও হতে পারে। তারা আলাদাভাবে কাজ করে একসঙ্গে বসতে পারে।

তবে লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, সরকার তালিকা করতে চাইলে এটা খুব একটা কঠিন হবে না। কারণ এর প্রতিটি ঘটনারই রেকর্ড আছে। সরকার চাইলে সব তথ্যই সরকার পাবে। কারণ ওই সময়ের অনেকেই তো এখনও বেঁচে আছেন। আপনার-আমার কাছে হয়তো কঠিন। আমরা অ্যাক্সেস পাবো না। যাদের ফাঁসি দিয়েছে, তাদের রেকর্ড তো জেলখানাতেই আছে। আন-রেকর্ডেড বা নিখোঁজ বলে তো কিছু নেই, সবই রেকর্ডেড ডকুমেন্ট। যাদের ফাঁসি দেয়া হয়েছে, কারও লাশই পরিবারের কাছে ফেরত দেয়া হয়নি। ফলে পরিবারের কাছে সবাই নিখোঁজ। এমনিতে তো কেউ নিখোঁজ হয়নি।

তিনি বলেন, সরকারের পক্ষে কোনো কিছুই কঠিন না। বঙ্গবন্ধুর ওপর অল পুলিশ রেকর্ডস সিন্স নাইনটিন ফোরটি এইট বাইর করছে না? প্রধানমন্ত্রী চাইলে অল রেকর্ডস তিনি পাবেন। তিনি নিজেই ডিফেন্স মিনিস্টার। তিনি তথ্য চাইলে ডিজিএআই, এনএসআই, পুলিশ, জেল সুপার সবাই সব রেকর্ড তাঁকে দিতে বাধ্য। আমরা সিভিলিয়ান হিসেবে হয়তো এসব পাবো না। কিন্তু তিনি তা পাবেন। কারণ সবই আছে। কোথাও না কোথাও ঠিকই আছে। বলা হয়, সব নথি নষ্ট করা হয়েছে। কিন্তু এসব গুরুত্বপূর্ণ নথির একাধিক কপি থাকার কথা। দায়িত্বশীল কেউ হয়ত সংগ্রহেও রেখেছেন।

লেখক ও সাংবাদিক আনোয়ার কবির বলেন, জিয়ার আমলে সশস্ত্র বাহিনীতে চলা হত্যা, গণহত্যা, গণফাঁসি নিয়ে তথ্যানুসন্ধানী কমিশন গঠনের জন্য অনেকদিন ধরেই কথা হচ্ছে। ‘৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর প্রথম এই কমিশন গঠনের দাবি ওঠে জাতীয় সংসদে। এরপর নানা সময়ে আমার বই ধরে সংসদে বিভিন্ন সংসদ সদস্য দাবি তুলেছেন। কিন্তু কমিশন গঠন হয় না, তথ্যের সন্ধানও হয় না। প্রাণ হারানো সেনার তালিকাও হয় না।

‘৯৬ সালে শেখ হাসিনার প্রথম সরকারের সময় জাতীয় সংসদের প্রতিরক্ষা বিষয়ক স্থায়ী কমিটির একটি উপ-কমিটি গঠন হয়েছিল সামরিক বাহিনীতে এসব অভ্যুথানের বিষয়ে খতিয়ে দেখতে। তবে কর্নেল শওকত আলীর নেতৃত্বাধীন সেই কমিটি খুব বেশি তথ্য জোগাড় করতে পারেনি।

কত মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল সশস্ত্র বাহিনীতে

১৯৭৭ সালের ২রা অক্টোবরের অভ্যুত্থান নিয়ে জায়েদুল আহসানের লেখা বই ‘রহস্যময় অভ্যুত্থান ও গণফাঁসি’। লেখক ওই ঘটনায় সামরিক আদালতের রায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া ব্যক্তিদের আংশিক তালিকা উদঘাটন করেছিলেন ঢাকা, বগুড়া ও কুমিল্লা কারাগারের নথি ঘেঁটে।

বইতে তিনি লিখেছেন: ১৯৭৭ সালের ২রা অক্টোবর ঢাকায় সামরিক বাহিনীর একটি অংশের অভ্যুত্থানের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তৎকালীন সেনাশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের নির্দেশে গঠিত বিশেষ সামরিক ট্রাইব্যুনালের কথিত বিচারে সেনা ও বিমানবাহিনীর যেসব সদস্যকে ফাঁসি দেয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে ১৯৩ জনের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়। ঐ ঘটনায় পূর্বাপর মৃতের সংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় এটা স্পষ্ট যে, বিচারের আওতার বাইরেও অনেককে মরতে হয়েছে।

অভ্যুত্থান-পরবর্তী ২ মাসে ১,১০০ থেকে ১,৪০০ সৈনিককে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে কিংবা ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করা হয়েছিল। ঐ সময় শুধু ঢাকা ও কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে সৈনিকদের ফাঁসি কার্যকর করা হয়। ঢাকায় ১২১ জন আর কুমিল্লায় ৭২ জনের ফাঁসি হয়। এ ছাড়া ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ৫ শতাধিক সৈনিককে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়।

অক্টোবরের ওই অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে প্রখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘আ লিগ্যাসি অব ব্লাড’ গ্রন্থে বলেছেন, এ সময় পরবর্তী ২ মাসে বাংলাদেশের সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী ১,১৪৩ জন সৈনিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।

বাংলাদেশে সে সময়ে প্রায় সকল কারাগারে গণফাঁসি দেয়ার ঘটনা ঘটেছিল। সেসময় বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে লেখা হয়েছিল, প্রহসন ও কোনো আইন-কানুনের পরোয়া না করে নামকাওয়াস্তে বিচার ও ফাঁসির ঘটনাগুলো ঘটানো হচ্ছিল। তবে আশ্চর্যজনকভাবে মানবাধিকার সংস্থাগুলো ছিল নিশ্চুপ। দেশে সেসময় অনেক বড় বড় বুদ্ধিজীবী ও লেখক জীবিত ছিলেন। তাদের অনেকেই এখনো বেঁচে আছেন, বর্তমান সরকারের নানা কাজের তীব্র সমালোচনায় মুখর থাকেন, মানবাধিকার নিয়ে লম্বা-লম্বা লেকচারও দেন। কিন্তু সেসময় তারা জিয়া-বন্দনায় ছিলেন মুখর।

‘সশস্ত্র বাহিনীতে গণহত্যা (১৯৭৫-৮১)’ বইয়ের লেখক সাংবাদিক ও গবেষক আনোয়ার কবির বলেন, আমি এই বিষয়টি নিয়ে সারা দেশ ঘুরে বেড়িয়েছি। নিহত ও নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে, সাবেক সেনা কর্মকর্তা বা সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছি। বিভিন্ন প্রকাশনা ও নথিপত্র ঘেঁটে আমার মনে হয়েছে, এই সংখ্যা নেহাত কম নয়। আনুমানিক ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার হবেই। তবে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে ১৯৭৭ সালে বিমানবাহিনীতে ঘটে যাওয়া এক ব্যর্থ অভ্যুত্থানকে ঘিরে।

১৯৮৭ সালে বিমানবাহিনী থেকে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইতিহাস’ বইতে এই অভ্যুত্থানের দিনকে কালো দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়। বইটিতে এই বিদ্রোহের কারণে সরকার নির্দেশিত বিশেষ সামরিক আদালতে বিচার ও পরে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় মোট ৫৬১ জন বিমান সেনা হারানোর ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়।

আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের বরাত দিয়ে ১৯৭৭ সালে ৩রা অক্টোবর নিউইয়র্ক টাইমস-এ 100 Reported killed in Dacca Coup Attempt শিরোনামে অভ্যুত্থান-সম্পর্কিত একটি সংবাদ প্রকাশিত হয়। ১৯৭৮ সালের ১০ই ফেব্রুয়ারি ওয়াশিংটন পোস্ট-এ Bangladesh Executions: A Discrepancy’ শিরোনামে এক প্রতিবেদনে বলা হয়: ১৯৭৮ সালের ১৯ জানুয়ারি স্টেট ডিপার্টমেন্টে পাঠানো একটি গোপন তারবার্তায় ঢাকার আমেরিকান দূতাবাসের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স জানান, তার পাওয়া তথ্য অনুসারে ২১৭ জন মিলিটারি সদস্যকে ক্যু প্রচেষ্টার পরবর্তীকালে হত্যা করা হয়।

‘আমাদের মনে হয় মিলিটারি কোর্ট স্থাপনের আগেই সম্ভবত এদের ৩০-৩৪ জনকে হত্যা করা হয়েছিল’, বলেন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স আলফ্রেড ই বার্গেনসেন।

টেনে-হিঁচড়ে গণফাঁসি ও দাফন

জায়েদুল আহসান পিন্টু তার বইতে লিখেছেন, ৭৭-এর ২রা অক্টোবর অভ্যুত্থান দমনের পর থেকেই সশস্ত্র বাহিনীর সহস্রাধিক সদস্যকে কোনো কিছু না জানিয়ে কর্তব্যরত অবস্থায় আটক করা হয়। এদের প্রায় সবাইকে পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগারে ঠাঁই না পাওয়াদের রাখা হয় সেনানিবাসের ভেতরে বিভিন্ন নির্যাতন সেলে। তাদের হাত-পা-চোখ বেঁধে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে দিনের পর দিন আটকে রাখা হয়। জিজ্ঞাসাবাদের নামে চলত অকথ্য নির্যাতন। সম্পূর্ণ উলঙ্গ করে ছোট একটি কক্ষে ৫০-৬০ জনকে একই সঙ্গে রাখা হতো।

অপরদিকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দিদের ৭ই অক্টোবর থেকে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য শুরু হয়। বন্দিদের এই বিচার চলে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত। ট্রাইব্যুনালে হাজিরা দেয়ার জন্য প্রতিদিন কারাগার থেকে বাসভর্তি করে সশস্ত্র প্রহরায় তাদের সেনানিবাসে নিয়ে যাওয়া এবং ফিরিয়ে আনা হতো। সামরিক আদালতের রায় প্রতিদিন রাত ৯টার মধ্যে বন্দি সামরিক ব্যক্তিদের জানানো হতো। যাদের ফাঁসির আদেশ হতো তাদের সঙ্গে সঙ্গেই কনডেমড সেলে পাঠানো হতো। রায় জানানোর রাতেই কিংবা পরের রাতে তাদের ফাঁসি কার্যকর করা হতো।

‘৭৭-এর অক্টোবর-নভেম্বর মাসে কারাগারগুলোতে যখন সন্ধ্যা নেমে আসত, তখন প্রতিটি কক্ষ থেকে ভেসে আসত গগনবিদারী কান্নার রোল। সামরিক বাহিনীর তত্ত্বাবধানে কারা কর্তৃপক্ষ এতই তড়িঘড়ি করে ফাঁসি দিচ্ছিল যে, একই নামের একজনকে ফেলে অন্যজনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিচ্ছিল। পশুপাখির মতো, জোর করে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে গলায় রশি বেঁধে ঝুলিয়ে দেয়া হতো। প্রাণ যাওয়ার আগেই হাত-পায়ের রগ কেটে ফেলা হতো। কারাগারের ড্রেনগুলো সৈনিকদের রক্তে ভরপুর হয়ে যেত। ড্রেনগুলোর সাথে সংযুক্ত খালের পানি রক্তে লাল হয়ে যেত।

অভ্যুত্থানের ফাঁদ?

১৯৭৭ সালের অক্টোবরের এই অভ্যুত্থান সম্পর্কে জেনারেল মীর শওকত আলীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন সাংবাদিক ও গবেষক জায়েদুল আহসান। এই অভ্যুত্থান সামরিক গোয়েন্দাদের দিয়ে জিয়ার পাতানো ফাঁদ কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে শওকত জানান, ঘটনাটা তার কাছেও রহস্যময় ছিল। জেনারেল মীর শওকত জানান, জিয়াউর রহমান অক্টোবরের বিদ্রোহের আগাম খবর পেয়েছিলেন মিশরের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আনোয়ার সাদাতের কাছ থেকে।

১৯৭৭ সালের ২৪শে সেপ্টেম্বর ৩ দিনের সফরে জিয়া মিশর যান, ২৭শে সেপ্টেম্বর ঢাকা প্রত্যাবর্তন করেন। ২৮শে সেপ্টেম্বর বিমানবাহিনী দিবসে তার প্রধান অতিথি থাকার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তিনি উপস্থিত থাকবেন না বলে জানিয়ে দেন। ২৮শে সেপ্টেম্বর বিমানবাহিনী দিবসে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে জিয়াসহ সব সিনিয়র অফিসারকে হত্যা করা হবে বলে আনোয়ার সাদাত তার নিজস্ব গোয়েন্দা নেটওয়ার্কের মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন।

মীর শওকত জানান, অভ্যুত্থান দমনে রেডিও স্টেশন, বিমানবন্দর, জিয়ার বাসভবনের আশপাশ এবং ক্যান্টনমেন্টের বিভিন্ন গেটে সৈনিকদের প্রাণহানি ঘটেছে। তার ধারণা, এই সংখ্যা একশর কম না। পরবর্তী সময়ে বিচারের মাধ্যমে ১,১০০ জনের মৃত্যুর খবর তিনি শুনেছেন, তবে নিশ্চিত নন বলে জানান।

১৯৭৮ সালের ৫ই মার্চ লন্ডনের দ্য সানডে টাইমস-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, গত অক্টোবর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ সেনাসদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। এই রক্তগঙ্গা কেবল আংশিকভাবে উন্মোচিত হয়েছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে।

বিমানবাহিনীর সাবেক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দ্য সানডে টাইমসকে বলেছেন, ৩০শে সেপ্টেম্বর বগুড়ায়, আর ২রা অক্টোবর ঢাকায় অভ্যুত্থানের পর সামরিক ট্রাইব্যুনালে ৮০০-এর অধিক সেনাসদস্যকে দণ্ডিত করা হয়েছে। সামরিক আদালতের সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্যাঙ্গারু কোর্টের পার্থক্য খুব বেশি নয়। ঢাকায় প্রায় ৬০০ সেনাসদস্যের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে ফায়ারিং স্কোয়াডে অথবা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে।

১৯৭৮ সালের ২৫শে মার্চ মুম্বাইয়ের ইকোনমিক অ্যান্ড পলিটিক্যাল উইকলির প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘যদিও অ্যামনেস্টি শুধু এটুকুই বলতে প্রস্তুত যে, কমপক্ষে ১৩০ জন এবং সম্ভবত কয়েকশর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তবে ঢাকার কিছু ওয়াকিবহাল সূত্রের মতে এ সংখ্যা ৭০০ থেকে হাজার পর্যন্ত হতে পারে।

অভ্যুত্থানের সংখ্যা কত?

জায়েদুল আহসান তার বইতে বলেছেন, বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকা, বই-প্রবন্ধ ও নানা গবেষকের লেখায় ৭৫-এর ১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, ৩রা নভেম্বর খালেদ মোশাররফের বিদ্রোহ, ৭ই নভেম্বরে পাল্টা বিদ্রোহ, ১৯৮১ সালের ৩০শে মে জিয়া হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে কমবেশি জানতে পেরেছি, যেন একটির পিঠে আরেকটি। শুধু জেনারেল জিয়ার আমলেই ছোট-বড় ২১টি অভ্যুত্থান ঘটেছে বলে গবেষক ও বিশ্লেষকদের লেখায় তথ্য পেলেও বিশদ কিছুই জানতে পারিনি। পিন্টুর মতে, পুরো ৫ বছরে হত্যাকাণ্ড, বিচার বা ক্যাঙ্গারু ট্রায়ালে জীবন হারানোদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা কারও কাছে নেই।

সুত্রঃ বাংলাদেশ ছাত্রলীগ এর নিজস্ব ভেরিফাইড ফেইসবুক পেইজ

আমি মোহাম্মদ শাফকত হাসান পিয়াল আমার বাড়ী যশোর আমি আওয়ামী লীগ এর একজন একনিষ্ঠ সমর্থক শিক্ষাগত যোগ্যতা এইচএসসি বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় এর অধীনে একই বিশ্ববিদ্যালয় এর অধীনে বিবিএ চলমান

আপনার রিএকশন কি?

একই রকম আরও কিছু আর্টিকেল

প্রতিভায় পরিপূর্ন বিএনপি – বিএনপি গট ট্যালেন্ট

এই মুহুর্তে বিরোধী দলের ভূমিকায় ধার করে থাকা দল বিএনপি-তে প্রতিভাধর মানুষের সংখ্যা সবসময়ের তুলনায় ছাড়িয়ে যাচ্ছে। এতদিন মেধাশূন্য একটা দল হিসেবেই মানুষ বিএনপিকে অপবাদ দিল কিন্তু সেইদিন গত হয়ে গেছে। আর বিএনপির এসব প্রতিভাধরদের নিয়েই হালকা লিস্ট পোস্ট।

রোজগারবিহীন খাম্বাস্টার লন্ডনে বিলাসী জীবনের নেপথ্যে অর্থপাচারঃ

ব্যক্তিগত রোজগার না থাকলেও লন্ডনে পরিবার নিয়ে বিলাসী জীবনযাপন করছেন একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলার মতো ভয়াবহ রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত এদের (বিএনপি)ভাইস চেয়ারম্যান খাম্বাস্টার খ্যাত তারেক জিয়া ওরফে খাম্বা তারেক ।

লিখেছেন Safkat Hasan Pial
105
54

রাজনীতিতে ১০ ডিসেম্বরই গুরুত্ব হারিয়েছে এরা (বিএনপি):ড. প্রণব কুমার পান্ডে

গত প্রায় দুই মাসের ওপর সময়কালে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ১০ ডিসেম্বর কেন্দ্রিক উৎকণ্ঠা বিরাজমান ছিল জনসাধারণের মনে। মাস দুয়েক আগে ঢাকার একটি জনসভায় বিএনপি নেতা আমান উল্লাহ আমান বলেছিলেন যে, ১০ ডিসেম্বর থেকে বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার নির্দেশনা অনুযায়ী বাংলাদেশ পরিচালিত হবে। সেই ঘোষণাকে সরকারের তরফ…

লিখেছেন Safkat Hasan Pial
101
52

দেশদ্রোহী ও পলাতক ড. রাজু আহমেদ দিপু এক অত্যন্ত জঘন্য ব্যাক্তি ও ভন্ড দেশপ্রেমিক রুপী শয়তান

ছোটবেলা থেকেই কিশোর গ্যাং, মারামারি এসব করেই একালায় হাঙ্গামা সৃষ্টি করত রাজু। ঢাকার আইডিয়েল কলেজে পড়াশুনার সময় ছাত্রদলের রাজনীতি শুরু করে এই দীপু। ছাত্রীদের হয়রানী , যৌন নির্যাতনসহ অসামাজিক কাজ করত এই দিপু।

লিখেছেন Safkat Hasan Pial
120
60

২০০১ থেকে ২০০৬: ভূমি দখল ও দুর্নীতিতে মগ্ন ছিল এদের (বিএনপি)নেত্রীর মন্ত্রী এবং মেয়রেরা

খালেদা জিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী ও বরিশালের সিটি মেয়র মজিবর রহমান সারোয়ারের দুর্নীতির রেশ পৌঁছে যায় দেশের সীমা পেরিয়ে বিদেশেও। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত জোট এবং তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদের সীমাহীন লুটপাট ও অর্থ পাচারের কারণে পাঁচবার…

লিখেছেন Safkat Hasan Pial
103
52

২০০১ থেকে ২০০৬: সাল এদের (বিএনপি)সময়ের সাবেক অর্থমন্ত্রীর ছেলে নাসের রহমানের কুখ্যাত বাহিনীর ভয়ে ঘরছাড়া হয় মৌলভীবাজারের সহস্রাধিক পরিবার

লিখেছেন Safkat Hasan Pial
101
52

২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময় সিলেট ও মৌলভীবাজারে সন্ত্রাস ছড়ায় বর্ষীয়ান বিএনপি নেতা সাইফুর রহমানের পুত্র নাসের রহমান। ছাত্রদলের বিশাল ক্যাডার বাহিনী দিয়ে পুরো এলাকার গড ফাদার হয়ে ওঠে নাসের। বিরেধী দল তো বটেই, নিজ দলের সিনিয়র নেতারাও ভয় পেতো নাসেরের বাহিনীকে। এ ব্যাপারে নাসের রহমান নিজেই বলেন, এলাকার লোকজন তাকে যুবরাজ বা সাদ্দাম হোসেন বলে ডাকে। মৌলভীবাজার বিএনপির সাবেক সভাপতি এবাদুর রহমান চৌধুরী আফসোস করে বলেন, হঠাৎ…